ওএমএস অনিয়মের অনুসন্ধানে ৪ সাংবাদিকের ওপর উপর্যুপরি  হামলা ও   চাঁদাবাজির মামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন 

ওএমএস অনিয়মের অনুসন্ধানে ৪ সাংবাদিকের ওপর উপর্যুপরি  হামলা ও   চাঁদাবাজির মামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন 

ওএমএস অনিয়মের অনুসন্ধানে ৪ সাংবাদিকের ওপর উপর্যুপরি  হামলা ও   চাঁদাবাজির মামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

মোঃ শফিকুল বাশার : সাভারে সরকারি চাল-আটা উধাওয়ের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই সাংবাদিকদের হেনস্তা—খাদ্য কর্মকর্তা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা, ৬ অক্টোবর ২০২৬: সাভারে ওএমএসের সরকারি চাল-আটা বিতরণে অনিয়ম ও কালোবাজারির অভিযোগের অনুসন্ধানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন চার সাংবাদিক। অভিযোগ উঠেছে, অনুসন্ধানের সময় প্রথমে ডিলারের লোকজন সাংবাদিকদের হুমকি দেন, পরে ৫-৭ জন যুবক অতর্কিত হামলা চালায়।
ঘটনার একপর্যায়ে দায়িত্বশীল খাদ্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ চার সাংবাদিককে থানায় নিয়ে গিয়ে ডিলারের অভিযোগের ভিত্তিতে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠায় বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৭ আগস্ট সকালে সাভার থানার চাপাইন মেম্বারের মোড়ে ডিলার জাহাঙ্গীরের ওএমএস দোকানে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টায় তদারককারী কর্মকর্তা মজুদ রেজিস্টার ও পরিদর্শন বহি যাচাই করে বিক্রির অনুমতি দেওয়ার পর ওএমএস পণ্য বিক্রি শুরু করার কথা। নির্ধারিত ব্যবস্থায় ভোক্তাদের মধ্যে চাল ও আটা বিতরণের কথা থাকলেও ঘটনাস্থলে গিয়ে এর সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখতে পান সাংবাদিকরা।
৩৩ বস্তার মধ্যে ২৮ বস্তা কোথায়?
সাংবাদিকদের দাবি, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দোকানে গিয়ে দেখা যায়—মোট ৩৩ বস্তার মধ্যে মাত্র ৫ বস্তা চাল রয়েছে। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী ২৮ বস্তা চাল ইতোমধ্যে দোকান থেকে উধাও হওয়ার অভিযোগ ওঠে।  শুধু তাই নয়, দোকানে উপস্থিত ভোক্তাদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, তাদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নিয়ে নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে ১৫ দিন পর আসতে বলা হচ্ছে; কিন্তু পরবর্তীতে পণ্য দেওয়া হচ্ছে না।
এ সময় সাংবাদিকরা ওএমএসের মজুদ, বিক্রির হিসাব ও বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
‘একটু পরেই সব জানতে পারবেন’—এরপরই হামলা
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি জেলা ও উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তাদের জানানো হলেও তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে আসতে গড়িমসি করেন বলে অভিযোগ।
এর মধ্যেই ডিলারের লোক পরিচয় দেওয়া এক যুবক সাংবাদিকদের ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করে তাদের হুমকি দেন বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়। তার কথিত হুমকি ছিল—“একটু পরেই সব জানতে পারবেন।।
এর কিছুক্ষণ পরই ৫-৭ জন যুবক সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হামলাকারীদের একজন নিজেকে সাভার প্রেস ক্লাবের নেতা বলেও পরিচয় দেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
রক্ষার বদলে হামলাকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের হামলাকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে চলে যান। পরবর্তীতে সাভার থানার এসআই আব্বাস সাংবাদিকদের ‘সেফ’ করার কথা বলে থানায় নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় বলে অভিযোগ।
‘ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা’—প্রমাণ কোথায়?
চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিলারের পক্ষ থেকে ‘ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি’ করার অভিযোগ আনা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের দাবি, এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং পরে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—ওএমএসের মজুদ ও বিক্রির অনিয়ম নিয়ে সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করতে গিয়ে হামলার শিকার হলেন, নাকি সেই অনুসন্ধান থামাতেই তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ,
পাল্টা অভিযোগ আনা হলো? ওএমএসের চাল আটার  হিসাবের জবাব কে দেবে ? একদিকে ৩৩ বস্তা চালের মধ্যে ২৮ বস্তা না থাকার অভিযোগ, অন্যদিকে ভোক্তাদের পণ্য না পাওয়ার অভিযোগ—দুই অভিযোগেরই নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন, সরকারি খাদ্যপণ্য বিতরণের দোকানে মজুদ ও বিক্রির হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্ব কার? তদারককারী কর্মকর্তা কখন দোকান পরিদর্শন করেছেন? কী পরিমাণ চাল-আটা দোকানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল? কতটুকু বিক্রি হয়েছে? কতটুকু অবশিষ্ট থাকার কথা? রেজিস্টারে কী হিসাব রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজির মামলা হলে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
চার দফা দাবি সংবাদ সম্মেলন থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে  ১. ডিলার জাহাঙ্গীর ও সংশ্লিষ্ট তদারককারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওএমএস পণ্য কালোবাজারি ও অনিয়মের অভিযোগ ভিডিও ফুটেজসহ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
২. চার সাংবাদিকের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের এবং হামলার নেপথ্যে ইন্ধনদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৩. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কথিত মিথ্যা ও বানোয়াট চাঁদাবাজির মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্ত করে প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ভিডিও ফুটেজে কী আছে ?
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, পুরো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভিডিও চিত্র ও ডকুমেন্টস সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য ভিডিও ফুটেজ, ওএমএস মজুদ রেজিস্টার, বিক্রয় রেজিস্টার, পরিদর্শন বহি, বরাদ্দপত্র এবং মামলার এজাহার পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
এ ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন সরকারি চাল-আটা বিতরণের অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত দুর্নীতিবাজ ওএমএস এর চাল আটা চুরিতে সংশ্লিষ্ট ডিলার ও কর্মকর্তাদের সনাক্ত  করার দাবী করা হয়েছে। লোকদেখানো তদন্তের নামে  অনিয়ম অনুসন্ধানকারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই মামলা দিয়ে মুল অপরাধিদের রক্ষায় ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলমান থাকবে?
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তেই এর জবাব মিলবে।

Facebook Comments Box

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *